ইতিহাসের পাতায় এ উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য কোন নবী-রাসুল (সাঃ)’র আগমন ঘটেনি। এ উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার-প্রসার হয়েছে নবী-রাসুল (আঃ)’র উত্তরসূরি হযরাতে ওলামায়ে কেরাম,সূফি সাধক,পীর কামেল এবং ওলী আল্লাহগণের বদৌলতে।
কথিত আছে,চট্টগ্রামকে বলা হয় বার আউলিয়ার পুর্ণ্যভূমি বা আউলিয়াদের শহর । এ শহরের চারপাশ জুড়ে বিভিন্ন আউলিয়ার মাজার রয়েছে। কোন মানুষ চট্টগ্রামে গেলে একটু প্রশান্তির ছোঁয়া পেতে এ মাজারে গিয়ে জিয়ারত করে। আর এমনি এক সুফি সাধক রাঙ্গামাটি জেলার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও স্বীকৃত এ উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক সূফি সাধক,সফল ইসলাম প্রচারক রাহনুমায়ে শরীয়ত ও তরিক্বত হযরাতুল আল্লামা আলহাজ্ব শাহ সূফি সৈয়দ নুর মোহাম্মদ শাহ (রহ:) (প্রকাশ মারিশ্যা বড় হুজুর কেবলা)।
জন্মস্থান: হুজুর কেবলার জন্ম স্থান চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার গশ্চি গ্রামের সৈয়্যদ আমানুল্লাহ শাহ(রাঃ) প্রকাশঃ গুরুন ফকিরের বাড়ীতে। গুরুন ফকির ছিলেন আল্লামা নুর মোহাম্মদ শাহ(রাঃ) দাদা। তিনি বেলায়ত সম্পন্ন ওলীয়ে কামেল-আধ্যাত্মিক সাধক ও আলেম দ্বীন। তার বহু কেরামত এলাকার বয়োবৃদ্ধদের কাছে শুনতে পাওয়া যায়।
হুজুর কেবলার বুযুর্গ পিতাঃ- হযরত আব্দুল কুদ্দুস(রহঃ)। তিনি পরহেযগার ও মুত্তাকি ছিলেন। তিনি গুরুন ফকিরের একমাত্র পুত্র। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নির্দেশ ছিল “একটি আয়াত হইলেও তোমরা আমার পক্ষ হইতে তাহা তোমরা প্রচার কর”।এই নির্দেশ পালনের তাগিদেই আল্লামা নুর মোহাম্মদ শাহ (রহ:) ইসলামের সঠিক দিক-নির্দেশনা বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের দূর্গম জেলা রাঙামাটিতে আসেন। আর এস তিনি ইসলামের বাণী প্রচার করতে লাগলেন। “মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহর অধিকতর নিকটবর্তী তারাই সূফি নামে পরিচিত”। সুফিরা তাদের অনুপ্রেরণা লাভ করেন আল-কুরআন থেকেই এবং তার কিছু কিছু আয়াতের ব্যাখ্যা করেন গুপ্তজ্ঞান ও মা-রিফাতের আলোকে।
আল্লামা নুর মোহাম্মদ শাহ (রহ:)-কে ছাত্র জীবনে তার ওস্তাদ তাকে “সূফি ছাহেব” বলে ডাকতেন। পরবর্তীতে সূফির যে রূপ তা বড় হুজুর কেবলা জীবনে সুর্যের আলোর মত স্পষ্ট, তার ওস্তাদ ছিলেন একজন বিখ্যাত ওলীয়ে কামেল।আল্লামা নুর মোহাম্মদ শাহ (রহ:) ছিলেন একাধারে ওলীয়ে কামেল,বেলায়তের ধারক বাহক,শরীয়তের রাহবার,তরিক্বতের রাহনুমা,দ্বীন ও মিল্লাতের পথ প্রদর্শক,আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের উজ্জল নক্ষত্র এবং দক্ষ আলেমে দ্বীন, বাতিলের বিরূদ্ধে সোচ্চার,আধ্যাত্মিক জগতের প্রাণ পুরুষ, শিক্ষাগুরু এবং বিভিন্ন গুণে গুণাণ্বিত সফল ব্যত্তিত্ব।
তার অসংখ্য কেরামতের মধ্যে কাপ্তাই লেক ও কাচালং নদীর ঘটনা অধিক পরিচিত। জানা যায় এই মহান অলির বংশধর স্বপ্নে আল্লাহর-নবীর নির্দেশে মদিনা থেকে বাংলাদেশে তথা চট্টগ্র্রামের স্থায়ী বসত গড়ে তোলেন। পরবর্তী চট্টগ্রাম ছেড়ে ছেড়ে দুর্গম পাহাড়ের মাঝে ইসলাম ধর্ম প্রচারে চলে আসেন।আর বংশধরের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষ আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত সম্পর্কে জানতে পেরেছে।
আর এ বংশের অলী নুর মোহাম্মদ এর নির্দেশে প্রথম রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে সর্বপ্রথম ঈদে মিলাদুন্নবি (সঃ) উপলক্ষে জশনে জুলুস উদযাপন করেছিলেন এবং তা প্রতি বছর পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। এই অঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) হুজুর কেবলার মধ্যমে শুরু হয়েছিল। হুজুর কেবলার চাল-চলন আচার-ব্যাবহার এতই সাধারণ ছিল যা সকলের নজর কেড়ে নিত। অসংখ্য বির্ধমী তার আচার ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।
আশেকে রাসুল, দেশখ্যাত মারিশ্যার বড় হুজুর কেবলা বললেই সকলে হুজুর কেবলাকে এক নামে চিনে। এছাড়াও হুজুর কেবলা অসংখ্য মসজিদ মাদ্রসা,মক্তব প্রতিষ্ঠা শুধু বাঘাইছড়িতে নয় দেশের বিভিন্ন জেলায় ধর্মীয় প্রতিষ্টান প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন। জীবনের অর্জিত সকল ধন সম্পদ টাকা পয়সা সব কিছু মসজিদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাসহ সমাজের উন্নয়নের কাজে ব্যায় করে গিয়েছিলেন।
তিনি আল্লাহ তায়ালার এমন নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা যিনি ইন্তেকালের অনেক আগে থেকেই ওফাতের তারিখ বার ও সময় বলে গিয়েছিলেন।
রাঙামাটির প্রবীণ আলেমে দ্বীন রাঙামাটি সিনিয়র মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আল্লামা নুরুল আলম হেজাজী সাহেব থেকে জানা যায়, হুজুর ওনাকে ইন্তেকালের আগ থেকেই ওফাতের তারিখ বলে দিয়েছিলেন। হুজুর কেবলার জানাজা ও কবর তারকিন করতে ও ওনাকে অসিয়ত করে গিয়েছিলেন।
রাঙামাটিতে হাজার হাজার মুসল্লির উপস্থিতিতে আল্লামা হেজাজী ওনার নির্দেশ মোতাবেক জানাজার নামাজ পড়িয়েছিলেন। রাঙামাটির বুকে এত বড় জানাজা সত্যিই বিরল যা আজ পর্যন্ত কারও চোখে পড়েনি। আমাদের হতবাগ করা সেই তারিখ টি ছিল ২০০১ সালের ২৯শে জুন (শুক্রবার)।
তার ইন্তেকালে পুরো দেশ, হাজার হাজার ভক্ত আশেক ও মুরিদানদের উপর শোকের ছায়া নেমে আসে। ওফাতের পর তার পবিত্র দেহ নিয়ে মানুষভর্তী জাহাজ ৭ঘন্টা নদীর পথ পাড়ি দিয়েছিল, যে নদীতে হাটু সমান পানি ছিল, যেখানে নৌকা দিয়ে চলাচল করাও কষ্টসাধ্য ছিল। আর এই আশ্চর্যজনক ঘটনাটি ঘটেছিল কাপ্তাই লেক (কাচালং নদীতে)। নদীর দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ হাটু পানিতে জাহাজ যাওয়ার এই বিরল দৃশ্য ও হতবাগ করে দেওয়ার মত ঘটনা দেখতে ছুটে এসেছিল। পাহাড়ের সমস্ত মানুষ এই আশ্চর্যজনক ঘটনার সাক্ষী যা এখনো কেও ভুলতে পারেনি।তাছাড়া ইন্তেকালের পর হুজুর অনেক মানুষের সাথে সরাসরি সাক্ষাত করার ঘটনা ঘটেছে এই অঞ্চলে। অনেক মানুষের মনে হুজুরের কামিলিয়্যত সম্পর্কে নতুন করে ভাবনার সৃষ্টি করেছে।
বাঘাইছড়িতে হুজুরের অবস্থান কালে এক সময় মহামারি কলেরা দেখা দিয়েছিল। প্রায় প্রতিটি এলাকার পরিবারের সকল সদস্যের কাছে এই রোগ দেখা দিলে মানুষ চরম অবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। এর পর যা ঘটেছিল তা সত্যিই সকলের কাছে চির স্বরর্ণীয় হয়ে থাকবে। রোগে আক্রান্ত গ্রামগুলোর পথ ও রাস্তা ধরে হাটা শুরু করলেন হুজুর কেবলা, আশ্চর্যজনক ভাবে হুজুর যেসব এলাকার রাস্তাগুলোতে হেটেছিলেন ঐসব এলাকার মহামারি রোগ চিরতরে বিদায় হয়ে যায়। ঠিক এভাবেই বাঘাইছড়িবাসি মহামারি নামক এই খোদায়ী গজব থেকে মুক্তি পান। তার জীবনিতে আরো অসংখ্য কেরামতি (আশ্চর্যজনক কাজ) পাহাড়ের প্রতিটি মানুষের মনের মাঝে গেঁথে আছে। হিন্দু, বোদ্ধ, খ্রিষ্টাানসহ আরো বির্ধমীরা হুজুরকে দেবতা বলে মানে। এছাড়া আরো হাজার হাজার কেরামতি আছে যা লেখে শেষ করা যাবে না।
ওফাতের পর থেকে হুজুরের সুযোগ্য বড় শাহাজাদা হযরতুল,আলহাজ্ব আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ আবদুন নুর সাহেবে’র নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণে বার্ষিক ফাতেহা শরীফ উদযাপিত হয়ে আসছে। তার প্রতিষ্ঠিত হাফেজিয়া মাদ্রাসা ময়দানের সামনে অনুষ্টিত বার্ষিক ফাতেহা শরীফে দেশ বরেণ্য ওলামায়ে কেরাম শিক্ষাবিদ,বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ, সাংবাদিক ছাড়াও অসংখ্যা ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও ভক্ত মুরিদান অংশ নিবেন। এ মহান ওলীর ফাতেহা শরীফে সকলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ( দৈনিক রাঙ্গামাটি, জানুয়ারি ২, ২০১৭)
ওলীর অপেক্ষায় রাংগামাটিতে জাহাজ ইঞ্জিন অচলঃ
রাজধানী ঢাকায় কোন এক ভক্তের বাসায় দাওয়াত গ্রহণ করেছিলেন–মারিশ্যা বড় হুজুর কেবলা (রহ.)। ঢাকার ভক্তের বাসা থেকে রাঙামাটি হয়ে –মারিশ্যায় আসতে হবে হুজুরের নিজ বাস ভবণে।
হুজুরের গাড়ী রাজধানী ঢাকা থেকে রাতে রওনা দিয়ে তা রাঙামাটি জেলার রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাটে পৌঁছতে হবে সকাল ৭.০০টার মধ্যে ।
রাতে হুজুরকে নিয়ে গাড়ী রওনা হলো।কিন্তু এখনো হুজুরের গাড়ী রিজার্ভ বাজার পৌঁছতে প্রায় ৪০ মিনিটের মতো সময় লাগবে।
এদিকে রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাটে হাজী ইউসুফ আলী নামে এক লঞ্চ কোম্পানীর জাহাজ রাঙামাটি টু- মারিশ্যা যাবে।
নির্দিষ্ট সময় সকাল ৭.০০ টায় জাহাজ ছাড়ার সময় হয়ে গেলো। তখন জাহাজ চালক ইঞ্জিন Start দিচ্ছে।
কিন্তু জাহাজ ইঞ্জিন চালু হচ্ছে না।কেন চালু হচ্ছে না।
জাহাজ কর্মকর্তারা খুঁটিনাটি পরীক্ষা করে দেখলো ইঞ্জিনের কোন সমস্যা নেই।
কিন্তু তবুও কেন জাহাজ Start হচ্ছে না কেও বুঝতে পারছিলনা।
ইঞ্জিন চালু করার জন্য বার বার চেষ্টা করছে কর্মকর্তারা।
ইঞ্জিনের ত্রুটি না হয়েও এটি চালু কেন হচ্ছে না এমন অদ্ভুত ঘটনা দেখে জাহাজ মালিক ইউসুফ আলী কোম্পানী চিন্তিত ও পেরেশানী হয়ে গেলেন।
ঠিক তখন ই হুজুরের গাড়ী লঞ্চ ঘাটে এসে পৌঁছাল।
যখন জাহাজ মালিক হুজুরকে দেখতে পেলেন তখনই জাহাজের ইঞ্জিন সাথে সাথে চালু হয়ে গেল।
জাহাজ মালিক ইউসুফ আলী কোম্পানী হুজুরকে সাথে সাথে বলতে লাগলেনঃ———–
হুজুর আপনি আসবেন তা আমাকে আগে জানিয়ে রাখলে আমি আপনার জন্য একটি জাহাজ রেখে দিতাম। আপনি এই জাহাজটি কেন আটকিয়ে রাখলেন — ইত্যাদি ইত্যাদি ———
প্রায় ৪০ মিনিট বিলম্ব হওয়ার পর অবশেষে পার্বত্য অঞ্চলের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ধর্মগুরু,যুগশ্রেষ্ট মহান অলি মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ নুর মোহাম্মদ শাহ(র:) প্রকাশ মারিশ্যা বড় হুজুর কেবলাকে নিয়েই জাহাজ রওনা হতে পেরেছিল সুদূর মারিশ্যা পানে।
ঘটনা এই যে, আল্লাহর নেক বান্দাদের প্রতি শুধু প্রাণী জীব মানুষ নয়, নিষ্প্রাণ জাহাজের ইঞ্জিনও অনুগত হয়ে যায়।
সংগ্রহে-
মোহাম্মদ আব্দুল জলিল
(সাধারণ সম্পাদক)
আন নূর ছাত্রকাফেলা বাংলাদেশ
বটতলী দরবার শরীফ,মারিশ্যা,বাঘাইছড়ি,রাংগামাটি।